Tuesday, November 13, 2018

অনেক প্রাপ্তির দ্বিশতক

অনেক প্রাপ্তির দ্বিশতক

শীতের বিকেলের সঙ্গে বৃষ্টি ঠিক যায় না। যায় না ঋতু বা সময়ের সঙ্গে মেলে না বলে। বছরখানেক ধরে টেস্ট ক্রিকেটে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশ দলের সঙ্গেও রেকর্ডের বন্যা ঠিক মেলার কথা নয়। কিন্তু মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সোমবারের শীতের বিকেলে ঠিকই বৃষ্টি ঝরল। রেকর্ডের বৃষ্টি। রানের বন্যা হলো বাংলাদেশেরও। মুশফিকুর রহিমের দ্যুতিময় ব্যাটিংয়ের ২১৯ রানের অপরাজিত ইনিংস এনে দিয়েছে এমন বৃষ্টি আর বন্যার মিশেল। বিজ্ঞাপনী ভাষায় যা- 'এক ইনিংস, অনেক অর্জনে'র। আনন্দের উপলক্ষ আর ব্যাপ্তি এমনই পর্যায়ের যে, কোনটির চেয়ে কোনটিকে এগিয়ে রাখা যায়- সেটিই এখন মধুর প্রশ্ন! বিশ্বের প্রথম উইকেটকিপার হিসেবে একাধিক ডাবল সেঞ্চুরি, নাকি বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে দুটি ডাবলের কীর্তি? দেশের জার্সিতে টেস্টের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস, নাকি বল ও সময়ের হিসাবে সবচেয়ে লম্বা দৈর্ঘ্যের ইনিংস? আবার মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশিদের প্রথম ডাবলের অর্জনকেও বা পিছিয়ে রাখা যায় কীভাবে? এসবের সঙ্গে চতুর্থ ও অষ্টম উইকেটে সর্বোচ্চ রান জুটির রেকর্ড তো আছেই। মুশফিকের এমন রেকর্ড বৃষ্টির সৌজন্যে জিম্বাবুয়ের সামনে প্রথম ইনিংসে ৫২২ রানের পাহাড় তুলে দিয়েছে বাংলাদেশ। দিনের শেষবেলায় ১৮ ওভার ব্যাট করে সফরকারীদের সংগ্রহ ১ উইকেটে ২৫ রান। হ্যামিলটন মাসাকাদজাকে ফিরিয়ে বোলিংয়ের সাফল্যটি তাইজুল ইসলামের।

মুশফিকের দুর্দান্ত এ অর্জনের শুরুটা হয়েছিল প্রথম দিন। ব্যাটিংয়ে নেমেছেন ২৬ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে দল যখন দিশেহারা, তখন। বিপদ থেকে উদ্ধার করে দিনশেষে দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন ৫ উইকেটে ৩০৩ রানের মাথায়। নিজে অপরাজিত ছিলেন ১১১ রানে। অপরাজিত থাকলেন গতকাল বিকেলে বাংলাদেশের ইনিংস ঘোষণার সময়ও। নামের পাশে ৪২১ বলে ২১৯ রান, ১৮ চার, ১ ছয়। পেছনে পড়ে গেছে দেড় বছর আগে নিউজিল্যান্ডে খেলা সাকিব আল হাসানের ২১৭ রান, দেশের মাটিতে তামিম ইকবালের সর্বোচ্চ ২০৬, উইকেটরক্ষক হিসেবে কুমার সাঙ্গাকারার এক ডাবল সেঞ্চুরি, মোহাম্মদ আশরাফুলের খেলা সর্বোচ্চ ৪১৭ বল আর আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ৫৩৫ মিনিট মাঠে থাকার কীর্তি। বাংলাদেশের মাটিতে খেলা আজহার আলীর ২২৬ রানের ইনিংসটাও হয়তো পেছনে পড়ে যেত, যদি অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ ইনিংস ঘোষণা আরেকটু পরে দিতেন! মুশফিকের অনেক অর্জনের এই মহীরুহ ইনিংসের পাশে শাখা-প্রশাখায় পরিণত মুমিনুল হকের ১৬১, মিরাজের অপরাজিত ৬৮ রানের ইনিংসগুলো। দ্বিতীয় দিনের শুরুতে দারুণ এসব কীর্তির ভিত্তি গড়া হয় মুশফিক-মাহমুদুল্লাহর ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে। অপরাজিত ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে নামা অভিজ্ঞ এ দু'জন দিনের প্রথম দুই ঘণ্টা কাটিয়ে দেন নির্বিঘ্নে। প্রতিদানে বিসর্জন দেন রান তোলার চিন্তা। লাঞ্চের আগ পর্যন্ত ৩০ ওভার ব্যাট করলেও রান ওঠে মাত্র ৬২, ওভারপ্রতি দুই করে! পরিকল্পনায় রানের গতি বাড়ানোর পর্ব ছিল দ্বিতীয় সেশন। কিন্তু বিরতির পর দ্বিতীয় ওভারেই জারভিসের চতুর্থ শিকার হয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন মাহমুদুল্লাহ; খানিকপর ফেরেন আরিফুল হকও। সিলেটের অভিষেক টেস্টে দৃঢ়তা দেখানো এ ব্যাটসম্যান পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে হন জারভিসের পঞ্চম শিকার। বাংলাদেশ দলের স্কোরবোর্ডে তখন ৭ উইকেটে ৩৭৮ রান। চারশ' পেরোনো যাবে কি-না এ নিয়ে যখন শঙ্কা, তখন অভাবনীয় এক জুটি গড়ে তোলেন মিরাজ-মুশফিক। যে জুটি চা বিরতি পার করে শেষ সেশনের এক ঘণ্টাও পার করে দেয় অনায়াসে। চারশ' থেকে সাড়ে চারশ' হয়ে পাঁচশ'ও পেরিয়ে যায় দলের সংগ্রহ। দেড় দিনের বেশি সময় ব্যাটিং করা ফেলা বাংলাদেশের অপেক্ষা ছিল তখন মুশফিকের ডাবল সেঞ্চুরির। অপেক্ষা ছিল মিরাজকে নিয়েও। ১৫৪তম ওভারে সিকান্দার রাজার তৃতীয় বলটিকে লং অনের ওপর দিয়ে ছয় হাঁকিয়ে নিজের দ্বিতীয় টেস্ট ফিফটি স্পর্শ করেন মিরাজ। পরের বলে সিঙ্গেল নিয়ে স্ট্রাইক দেন ১৯৯ রানে থাকা মুশফিককে। এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৯৯ রানে আউট হওয়া মুশফিক আগের ওভারে ৬ বল খেলেও রান নিতে পারেননি, মেডেন দিয়েছিলেন। এবার আর অপেক্ষা বাড়ালেন না। রাজার পঞ্চম বলটিকে স্কয়ার লেগে ঠেলেই দ্রুত নিয়ে নেন এক রান। মাইলফলকময় ডাবল সেঞ্চুরি! ছন্দময় ব্যাটিং ধরে রেখে পেরিয়ে যান তামিমের ২০৬ আর সাকিবের ২১৭ রানও। এরপর যেমনটি হওয়ার তেমনটিই হয়েছে। মুশফিকের দেশের সর্বোচ্চ রানের ইনিংসধারী হয়ে যাওয়ার পরই ৭ উইকেটে ৫২২ রানে ইনিংস ঘোষণা করে দেয় বাংলাদেশ।

লক্ষ্য ছিল শেষবেলায় জিম্বাবুয়ের এক বা একাধিক উইকেট তুলে নেওয়া। অভিষিক্ত সৈয়দ খালেদ আহমেদ নিজের দ্বিতীয় ওভারেই মাসাকাদজাকে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন স্লিপে। তবে মোহাম্মদ মিঠুনের দিকে যেতে থাকা বল ঝাঁপিয়ে ধরতে গিয়ে ফসকে ফেলেন দ্বিতীয় স্লিপে থাকা আরিফুল। তবে মাসাকাদজাকে শেষ পর্যন্ত ঠিকই আউট করা গেছে। পনেরোতম ওভারের প্রথম বলে তাইজুলের স্পিনে ক্যাচ দেন স্লিপে মিরাজের হাতে। দিনশেষে মুশফিক বলেছেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট না করার চেষ্টা থাকবে তাদের। সেটি হতে হলে জ্বলে উঠতে হবে আজ বোলারদের। বাকি থাকা ৪৯৭ রানের মধ্যে তুলতে হবে জিম্বাবুয়ের ১৯ উইকেট!
পরবর্তী খবর পড়ুন : ভোট ৩০ ডিসেম্বর

No comments:

Post a Comment