বেশির ভাগই পুরোনো মুখ
- সোমবার থেকে বিএনপির প্রার্থীদের প্রত্যয়নপত্র দেওয়া শুরু
- ২০০১ ও ২০০৮ সালের প্রার্থীদের প্রাধান্য দিচ্ছে বিএনপি
- এবার শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে তেমন কেউ বাদ পড়েননি
- জোট সরকারের সময় বিতর্কিতদের অনেকে তালিকায় আছেন
- খালেদা তিন আসনে প্রার্থী, তিন আসনেই আছে বিকল্প প্রার্থী
২০০১ ও ২০০৮ সালের দলীয় প্রার্থীদের অধিকাংশই এবারও বিএনপির মনোনয়ন তালিকায় রয়েছেন। গতকাল সোমবার বিকেল থেকে বিএনপি দলীয় প্রার্থীদের প্রত্যয়নপত্র দেওয়া শুরু করে। তাতে দেখা যায়, মূলত ২০০১ সালের নির্বাচনকে ভিত্তি ধরে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত যেসব আসনে দলীয় মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হয়েছে, তাতে বেশির ভাগই পুরোনো মুখ। এর মধ্যে চারদলীয় জোট সরকারের সময় বিতর্কিতদের অনেকেও আছেন। অনেক আসনে একাধিক প্রার্থী রাখা হয়েছে।
গতকাল মনোনয়নের চিঠিপ্রাপ্তদের মধ্যে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আবদুল আলীমের ছেলে ফয়সাল আলীমও রয়েছেন। তিনি জয়পুরহাট-১ আসনের প্রার্থী। নানান ঘটনায় বিতর্কিত আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ গোলাম মাওলা রনি। তিনি গতকাল বিএনপিতে যোগ দিয়েই পটুয়াখালী-৩ আসনের মনোনয়নের চিঠি পান।
চারদলীয় জোট সরকারের সময়েই ২০০৪ সালে বিএনপির মন্ত্রী আমিনুল হক, উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং তখনকার সাংসদ নাদিম মোস্তফার বিরুদ্ধে জেএমবি নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইকে পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা করার অভিযোগ ছিল। এবারও এই তিনজন দলীয় মনোনয়ন পেলেন।
২০০৪ সালের এপ্রিল–মে মাসে রাজশাহী অঞ্চলের বাগমারা, রানীনগর ও আত্রাই উপজেলায় বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জঙ্গিরা ‘সর্বহারা’ দমনের নামে হত্যা–নির্যাতনসহ অরাজকতা কায়েম করে। বিএনপি আমলেই ২০০৬ সালের মার্চে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাংলা ভাই টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে যে জবানবন্দি দেন, তাতে আমিনুল হক, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার ও নাদিম মোস্তফার সহযোগিতা পাওয়ার কথা বলেছিলেন।
বিএনপির মনোনয়ন প্রসঙ্গে নাগরিক অধিকার সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিরোধী দলের মধ্যেও গুণগত পরিবর্তন দেখছি না। এখানে ভালো কিছু আশা করা দুরূহ।’
তিনি মনে করেন, প্রার্থী মনোনয়নে মূল বিবেচনা ছিল মাঠে টিকে থাকার বিষয়টি। এখানে যোগ্যতা, নৈতিকতা এ বিষয়গুলোর চেয়ে প্রতিপক্ষকে মাঠে মোকাবিলার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে রাজনৈতিক কলুষতা অব্যাহত থাকবে।
দলীয় সূত্র জানায়, এবার শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে তেমন কেউ বাদ পড়েননি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলেও তাঁকে তিনটি আসনে প্রার্থী করা হয়েছে। আসনগুলো হলো ফেনী-১ এবং বগুড়া-৬ ও ৭। অবশ্য এই তিন আসনেই বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন কুমিল্লা-১, মওদুদ আহমদ নোয়াখালী-৫, মির্জা আব্বাস ঢাকা-৮, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ঢাকা-৩, মঈন খান নরসিংদী-২, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। তাঁরা প্রত্যয়নপত্র নিয়েছেন। তবে স্থায়ী কমিটির চার সদস্য জমির উদ্দিন সরকার, মাহবুবুর রহমান, নজরুল ইসলাম খান ও সালাহউদ্দিন আহমদ নির্বাচন করছেন না।
খালেদা জিয়া তিন আসনে প্রার্থী। যদিও বিকল্পও আছে। ২০০১ ও ২০০৮ সালের প্রার্থীদের প্রাধান্য।
ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় দেখা যায়, সংস্কারপন্থী বলে পরিচিত প্রায় সবাই মনোনয়ন পেয়েছেন। এর মধ্যে রাজশাহী-৪ আবু হেনা, নওগাঁ-৬ আলমগীর কবির, বরিশাল-১ জহিরউদ্দিন স্বপন, নরসিংদী-৪ সাখাওয়াত হোসেন বকুল, বরিশাল-২ আসনে শহীদুল হক জামালকে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে এসব আসনের মনোনয়ন তালিকায় দুটি করে নাম আছে।
গতকাল বিকেলে প্রথমে রংপুর, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হয়। পঞ্চগড়-১ আসনে নওশাদ জমির, বরগুনা-১ মতিউর রহমান তালুকদার ও নজরুল ইসলাম মোল্লা, বরগুনা-২ নুরুল ইসলাম মনি, পটুয়াখালী-১ আলতাফ হোসেন চৌধুরী ও সুরাইয়া আক্তার চৌধুরী, পটুয়াখালী-২ শহীদুল আলম তালুকদার ও সালমা আলম, পটুয়াখালী-৩ হাসান মামুন ও মো. শাহজাহান, পটুয়াখালী-৪ এ বি এম মোশাররফ হোসেন ও মনিরুজ্জামান মুনিরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
আরও মনোনয়ন পেয়েছেন ভোলা-২ আসনে হাফিজ ইব্রাহিম ও রফিকুল ইসলাম মনি, ভোলা-৩ হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও কামাল হোসেন, ভোলা-৪ নাজিমউদ্দিন আলম ও নুরুল ইসলাম, বরিশাল-১ আসনে জহিরউদ্দিন স্বপন ও আবদুস সোবহান, বরিশাল-২ সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু ও শহীদুল হক জামাল, বরিশাল-৩ জয়নুল আবেদীন ও সেলিমা রহমান, বরিশাল-৪ মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ ও রাজিব আহসান, বরিশাল-৫ মজিবর রহমান সরোয়ার ও এবায়েদুল হক চান, বরিশাল-৬ আবুল হোসেন খান ও আবদুর রশিদ খান।
দ্বৈত প্রার্থীর বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা প্রতিটি আসনে দুজন করে প্রার্থীকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিচ্ছি। কোনো কারণে একজনের না হলে অন্যজন যাতে সুযোগ পান। আর আমাদের সিনিয়র নেতারা যেখানে যাঁরা আছেন, সেখানে তাঁরাই মনোনয়ন পেয়েছেন।’
রাজশাহীতে ঘোষিত ছয়টি আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া নেতাদের চারজন ছাড়া অন্যরা নতুন মুখ। এর মধ্যে সাবেক মন্ত্রী আমিনুল হক রাজশাহী-১ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন। রাজশাহী-২ মিজানুর রহমান মিনু ও সাঈদ হাসান, রাজশাহী-৩ শফিকুল হক ও মতিউর রহমান, রাজশাহী-৪ আবু হেনা ও আবদুল গফুর, রাজশাহী-৫ নাদিম মোস্তফা ও নজরুল মণ্ডল, রাজশাহী-৬ আবু সাঈদ ও নুরুজ্জামান খান।
পাবনা–৫ আসনে শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, লালমনিরহাট–৩ আসাদুল হাবিব দুলু এবং জয়পুরহাট–২ আসনে আবু ইউসুফ খলিলুর রহমান ও গোলাম মোস্তফাকে মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হয়।
পিরোজপুর-৩ আসনে রুহুল আমিন দুলাল ও শাহজাহান মিয়া, কুড়িগ্রাম-১ সাইফুর রহমান, কুড়িগ্রাম-২ আবু বকর সিদ্দিক ও সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, কুড়িগ্রাম-৩ তাসভীরুল ইসলাম ও আবদুল খালেক, কুড়িগ্রাম-৪ আজিজুর রহমান ও মোখলেছুর রহমান।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে দুজন রয়েছেন সাবেক সাংসদ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ শাহজাহান মিয়া ও বেলাল বাকি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আবদুল ওয়াহেদ ও হারুনুর রশীদ।
নাটোরে দলের প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া নেতাদের মধ্যে সালেক চৌধুরী, শামসুজ্জোহা খান, শামসুল আলম প্রামাণিক ও আলমগীর কবির সাবেক সাংসদ। নওগাঁ-১ সালেক চৌধুরী, মোস্তাফিজুর রহমান ও মাসুদ রানা, নওগাঁ-২ শামসুজ্জোহা খান ও খাজা নজিবুল্লাহ চৌধুরী, নওগাঁ-৩ রবিউল আলম ও পারভেজ আরেফীন সিদ্দিকী, নওগাঁ-৪ শামসুল আলম প্রামাণিক ও একরামুল বারী, নওগাঁ-৫ জাহিদুল ইসলাম ও নজমুল হক, নওগাঁ-৬ আলমগীর কবির ও শেখ রেজাউল ইসলাম।
ফেনী-২ আসনে অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন (ভিপি জয়নাল), ফেনী-৩ আবদুল অউয়াল মিন্টু। লক্ষ্মীপুর-২ আবুল খায়ের ভূঞা, লক্ষ্মীপুর-৩ শহীদ উদ্দীন চৌধুরী, নোয়াখালী-১ মাহবুব উদ্দিন খোকন, নোয়াখালী-২ জয়নুল আবদিন ফারুক, নোয়াখালী-৪ মো. শাহজাহান। দিনাজপুর-১ মামুনুর রশীদ ও মঞ্জুরুল ইসলাম, দিনাজপুর-২ সাদিক রিয়াজ পিনাক, দিনাজপুর-৩ মোফাজ্জল হোসেন ও সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, দিনাজপুর-৪ হাফিজুর রহমান ও আক্তারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর-৫ জাকারিয়া বাচ্চু ও এ জেড এম রেজোয়ানুল হক, দিনাজপুর-৬ লুৎফুর রহমান ও শাহীনুর ইসলাম।
রংপুরের ছয়টি আসনের প্রায় সবাই নতুন। কেবল রংপুর-২ আসনের মোহাম্মদ আলী জাতীয় পার্টির (জাপা) সাবেক সাংসদ। রংপুর-১ মোকাররম হোসেন, রংপুর-২ ওয়াহেদুজ্জামান ও মোহাম্মদ আলী, রংপুর-৩ রিটা রহমান ও মোজাফ্ফর আহমদ, রংপুর-৪ এমদাদুল হক ভরসা, রংপুর-৫ ডা. মমতাজ ও সোলায়মান আলম, রংপুর-৬ সাইফুল ইসলাম।
নাটোর-১ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন তাইফুল ইসলাম ও কামরুন্নাহার শিরিন, নাটোর-২ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। সিরাজগঞ্জ-১ কনকচাঁপা ও নাজমুল হাসান, সিরাজগঞ্জ-২ রোমানা মাহমুদ ও ইকবাল হাসান মাহমুদ, সিরাজগঞ্জ-৩ আইনুল হক ও আবদুল মান্নান তালুকদার, সিরাজগঞ্জ-৫ আবদুল্লাহ আল মামুন ও আমীরুল ইসলাম খান, সিরাজগঞ্জ-৬ এম এ মুহিদ ও কামরুদ্দিন এয়াহিয়া খান।
প্রার্থীদের তালিকায় দেখা যায়, দলের পুরোনো সাংসদের অধিকাংশকেই মনোনয়ন তালিকায় রাখা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কজন থাকেন, তা নিয়ে কৌতূহল আছে।
তালিকায় দেখা গেছে, নেতাদের অনেকেই স্ত্রীকে বিকল্প প্রার্থী করেছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা মওদুদ, আলতাফ হোসেন চৌধুরীর স্ত্রী সুরাইয়া আখতার, পটুয়াখালী-২ শহীদুল আলম তালুকদারের স্ত্রী সালমা আলম, রুহুল কুদ্দুস তালুকদারের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন। এ ছাড়া কয়েকজন প্রার্থী তাঁদের ছেলেদের বিকল্প প্রার্থী করে রেখেছেন। এ নিয়ে দলে নানা আলোচনা-সমালোচনা আছে।

No comments:
Post a Comment